হিম হাতে উষ্ণতার ছোঁয়া

হিম হাতে উষ্ণতার ছোঁয়া

ঘুমকাতুরে চোখগুলোতে ঘুম নেই । ঘুমালেই যদি আগুন নিভে যায় । যদি দানব ফিরে আসে  ! তাই ঘুমচোখে আরো কিছু কাগজ বা কাপড়ের টুকরো দিয়ে উষ্কে দেয়া লাল নীল লেলিহান। প্রচন্ড শীতের রাতে সুনসান শহরের রাস্তায় দাঁত-কপাটি দিয়ে কাঁপতে থাকে বাস্তুহারাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আরো একটি শীতের রাত, আরো এক রাত সংসার পাতা অমানবিক শীতের সাথে। এমনই কিছু অসহায় মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগ হয় গত ২৩ জানুয়ারি, ২০১৫ মাইক্রোবায়লজি অ্যাসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ আয়োজিত শীতবস্ত্র বিতরণ আয়োজনে।

         প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দুইশ’ শীত বস্ত্রের। অণুজীববিদ্যা বিভাগে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের ব্যবহৃত পুরোনো শীতের জামাটি দান করে দিলেই অন্তত ২০০ মানুষ আবদ্ধ হতে পারে উষ্ণতার আলিঙ্গনে।সেই ভাবনা থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়লজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব ইমরানুল হক, পিএইচডি এর নেতৃত্বে শীত বস্ত্র সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। ২০ জানুয়ারি, ২০১৫ থেকে শুরু করে মাত্র তিন দিন সময় নিয়ে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত চলতে থাকে শীত বস্ত্র সংগ্রহ।বাঙ্গালী এক উন্মাদ জাতি। কেউ ভাল কাজে এক পা এগিয়ে এলে বাকিরা এগিয়ে আসে দশ পা। তাই ২০০ এর জায়গায় সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ২০০০ বা তারও বেশিতে। বস্ত্র সংগ্রহ চলে নিজের বাসা থেকে, আত্মীয়-স্বজন , পাড়া প্রতিবেশী থেকে পড়াতে যাওয়া টুইশান বা কোচিং সেন্টার পর্যন্ত। যারা নিজের বাসায় থেকে পড়াশোনা করে শুধু তারাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা অণুজীববিদ্যার ছাত্র-ছাত্রীরাও এগিয়ে আসে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে। এর ফলে বস্ত্রবিতরণকারীদের পুরো রাত ব্যস্ত থাকতে হয়েছে বস্ত্র বিতরণে। চট্টেশ্বরী রোড থেকে যাত্রা করে কাজীর দেউড়ি হয়ে চলে বস্ত্র বিতরণের কাজ। ফুটপাতে শীতে কাবু কোন বৃদ্ধ যখন হাতে জ্যাকেট আর মাফলার পেয়ে খুশিতে কেঁদে ফেলেন, হাত তুলে সর্বশক্তিমানের কাছে দোয়া করেন, তার চেয়ে ভাল অনুভূতি বোধ হয় আর হয়না। কাজীর দেউড়িতে কিছু দুঃস্থ শিশু আর মহিলার মাঝে বিতরণ শেষে আমরা এগিয়ে চলি আমাদের মূল গন্তব্য ফিরিঙ্গি বাজার , লইট্টাঘাটা এলাকায়। পথে আরো কিছু বিতরণ চলে নিউ মার্কেট সংলগ্ন আলকরণ এলাকার অলিগলিতে। দু’টো ভ্যানের অপরটি লাল-দীঘির পাড় হয়ে কোতোয়ালি থানাতে একত্রিত হওয়ার কথা । তাই তাদের জন্যে চলে অপেক্ষা। তারা ফিরে এলে শুনতে পেলাম গরম কাপড়ের চাহিদা এতই বেশি যে মানুষ জন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তাদের ভ্যানে। অনেক কষ্টে যাদের সত্যিই দরকার ছিল এই সামান্য বস্ত্রের কিছু পাওয়ার তাদের মাঝেই যতটা সম্ভব বিলিয়ে তারা ফিরেছেন। এর পর ফিরিঙ্গি বাজারে। বেশির ভাগই জেলে সম্প্রদায়ের পুরুষ মানুষ যাদের শীত ঠেকানোর বস্ত্র বলতে কারো কারো গায়ে শুধু একটি শার্ট আর পরনে নোংরা-ময়লা লুঙ্গি। সবচেয়ে করুণ যে দৃশ্য দেখতে হল সেখানে তা যে কারো পক্ষেই সহ্য করা কঠিন। শীতের ঘোরে ঘুমিয়ে আছেন মা , গায়ে একটি মাত্র পাতলা কম্বল। আর সেই ফ্লোরে বিছানো সেই কম্বলের উপরই উপুড় ,যবুথবু হয়ে ঘুমিয়ে আছে তার ৩-৪ বছর বয়সী মেয়েশিশু।আমাদের সংগ্রহে থাকা কিছু কাপড় দিয়ে তাদের সাহায্য করা হয়। সাহায্য নিতে এসে লাইনে দাঁড়ানো আনুমানিক একশ’ জনের মাঝে প্রয়োজন অনুযায়ী বিতরণ করা হয় জ্যাকেট, মাফলার , সোয়েটার, কানটুপি সহ ফুলহাতা টি-শার্ট, শার্ট ও প্যান্ট। এর পর তরুণদল এগিয়ে চলে মাদারবাড়ি রেলওয়ে বস্তিতে।

         আমাদের শীত বস্ত্র বিতরণের অন্যতম লক্ষ্য ছিল যারা সত্যিকার অর্থেই সাহায্যের দাবিদার তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেয়া। আর এই বস্তি সে রকমই একটি স্থান। অন্যান্য এনজিও বা সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর কাছে এখানে বসবাসকারীদের পরিসংখ্যান হয়তো ততটা পরিষ্কার নয়। তাই অন্য যে কোন  এলাকার চেয়ে সাহায্যের পরিমাণ অনেক কম এবং স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা অনেক বেশি। রাত দেড়টা থেকে শুরু করে প্রায় ভোর শোয়া ৫ টা পর্যন্ত চলতে থাকে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মাঝে শীত বস্ত্র বিতরণ। এখানে থাকা শীতার্ত বৃদ্ধ মহিলা , পুরুষ ও বাচ্চাদের মধ্যে বিতরণ করা হয় শীতের কাপড়, শালসহ পরিধেয় বস্ত্র।

        শীত বস্ত্র বিতরণে অংশ নেয়া সবাই ছিল খুবই তৎপর। শীতার্তদের জন্যে কাপড় সংগ্রহ থেকে শুরু করে তা বাছাই করা ও শেষ পর্যন্ত তা বিতরণে সবাই ছিল খুবই আন্তরিক এবং একনিষ্ঠ। সবার চেষ্টা ছিল এই সমাজের অল্প কিছু মানুষের জন্যে হলেও নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার, দেশের উন্নয়নে নিজের অংশীদারীত্ব প্রতিষ্ঠা করার, মানুষ মানুষের জন্যে এই কথা আরেকবার প্রমাণ করার, তারুণ্যকে তার স্বাভাবিক শক্তি নিয়ে জনসেবায় নিয়োজিত করার । তাই সারা রাতের পরিশ্রমের পরও সবার মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি আর পরের বার কীভাবে আরো ভালো আয়োজন করা যায় তার প্রস্তুতি কথা। আর যতদিন এই তারুণ্য নির্ঘুম থাকবে, ততদিন আশার সলতে জ্বলবে দেদীপ্যমান। ততদিন দেশ এগোবেই।